ঢাকামঙ্গলবার, ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
আজকের সর্বশেষ সবখবর

তালেবান সরকারের সামনে যে চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক । বাংলালাইভ২৪.কম
সেপ্টেম্বর ৯, ২০২১ ৭:০৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

শেষ প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার পর কার্যত পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ এখন তালেবানের হাতে। পানশির উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ কাদের কাছে যাচ্ছে, সেটা স্পষ্ট হতে মাত্র কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হলো। সারা উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর প্রতীকী মূল্যে গুরুত্বপূর্ণ ‘বিশ্বাসঘাতক’ এই উপত্যকার জয় খুব একটা কঠিন ছিল না। বিরোধী শিবিরের শেষ দুর্গের পতন হয়েছে।

এখন তালেবান যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রস্তুত। একটা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পক্ষে শাসক হিসেবে রূপান্তরিত হওয়া মোটেই সহজ নয়। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর শক্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জয়ী হয়ে তালেবান ক্ষমতায় এসেছে ঠিকই, কিন্তু এখন সামনে তাদের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কয়েক দশকের সংঘাতে বিধ্বস্ত এবং তিক্তভাবে বিভক্ত একটা দেশের সরকার পরিচালনা করা সম্ভবত যুদ্ধজয়ের চেয়ে অনেক কঠিন।

অবশেষে তালেবান তাদের অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা করেছে। এ সরকারে তাদের সব নেতাকেই যুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এটা স্পষ্ট যে নতুন শাসকদের অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের কোনো উদ্দেশ্য নেই। সম্ভবত আফগান তালেবানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নিজেদের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা। অনেক মতাদর্শিক ও উপদলীয় কোন্দল, যেগুলো যুদ্ধের সময় চাপা পড়েছিল, ক্ষমতায় আসার পর সেগুলো আবার সামনে চলে এসেছে। চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ না থাকায় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে বাধ্য।

অনেকের আশঙ্কা, অন্তর্বর্তী সরকার তালেবানের মধ্যকার ফারাকগুলো বাড়িয়ে দেবে। মধ্যপন্থীরা প্রথম তালেবান যুগের কঠোর ঐতিহ্য থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা সংস্কারে যেতে রাজি নয়। দুইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব এখন তীব্র হবে। যুদ্ধকালে তালেবান একটা শিলীভূত শক্তি হিসেবে ছিল। সে কারণে সামরিক কৌশল ও অন্য নীতির ক্ষেত্রে তাদের মধ্যকার পার্থক্যগুলো প্রচ্ছন্ন ছিল। নিজেদের মতপার্থক্যের প্রভাব প্রতিরোধযুদ্ধে পড়েনি। যুদ্ধ শেষে এখন পার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে।

মাঠের কমান্ডারদের মধ্যে বেশির ভাগই দৃষ্টিভঙ্গিতে কট্টর। তাঁদের মধ্যে একটা অংশ ২০০১ সালের তালেবান সরকার পতনের পর যুক্ত হয়েছেন। বয়সে তখন ছিলেন তাঁরা কিশোর। নতুন প্রজন্মের কমান্ডাররা পুরোনোদের মৃত্যুর পর কিংবা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। আমেরিকার সঙ্গে যাঁরা শান্তি চুক্তি এগিয়ে নিয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই বয়স্ক। তাঁদের অনেকেই জেলে ছিলেন কিংবা ছাড়া পাওয়ার পর বিদেশে ছিলেন। তাঁরা তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক বেশি নমনীয়তা দেখিয়েছেন।

তথাকথিত ইসলামিক আমিরাতের সামনে এখন আর কোনো সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ নেই। কিন্তু এ দাবি প্রতারণামূলক হতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে আগের মতো বর্বর পন্থায় তালেবান আর আফগানিস্তান শাসন করতে পারবে না।

কিন্তু কেউ আশা করে না, একটা রক্ষণশীল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সংগঠন ইসলামিক আমিরাতের ব্যানারে এসে, তাদের পুরোনো ধ্যানধারণা পুরোপুরি রূপান্তর করে ফেলতে পারবে। এখন প্রধান ইস্যু হচ্ছে তালেবান নেতৃত্ব বহুত্ববাদকে কতটা গ্রহণ করতে পারবে? নারীর প্রতি তালেবানের যে প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি, সেখান থেকে তারা কতটা বেরিয়ে আসতে পারবে? তালেবান শাসনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নির্ভর করছে সেটার ওপরেই। নতুন সরকারের জন্য এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা জরুরি।

আপাতদৃষ্টিতে পানশির উপত্যকার পতনের পর তালেবান এখন আফগানিস্তানের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করছে। তথাকথিত ইসলামিক আমিরাতের সামনে এখন আর কোনো সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ নেই। কিন্তু এ দাবি প্রতারণামূলক হতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে আগের মতো বর্বর পন্থায় তালেবান আর আফগানিস্তান শাসন করতে পারবে না। ১৯৯০-এর দশকের আফগানিস্তান এটা নয়।

বহুত্ববাদী রাজনৈতিক পরিবেশের অঙ্গীকার থেকে সরে আসাটা আফগানিস্তানের নতুন শিক্ষিত প্রজন্ম মেনে নেবে না। তারা তাদের নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত আফগান দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। তালেবানের নিশ্চয়তার বাণী তাঁদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। অস্বস্তিটা এখানে বাস্তবসম্মত।

আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক নারীদের যে বিক্ষোভ, সেটা তাঁদের অধিকার সংকুচিতচেষ্টার বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই প্রতিবাদে অংশ নেওয়া নারীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। কিন্তু তাঁদের এই প্রতিবাদের অর্থ হচ্ছে অধিকার খর্ব হলে জনগণ আবার লড়াইয়ের মাঠে নামতে প্রস্তুত।

আফগানিস্তানে আবার বিতর্কিত আইনগুলো চালু হবে, সেই ভয়েই শিক্ষিত লোকজন সেখান থেকে চলে গেছেন। প্রতিবাদে যেকোনো দমনপীড়ন, অসন্তোষের আগুন জ্বালিয়ে দেবেন। রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং মানবাধিকার ইস্যুর ওপর দ্বিতীয় তালেবান সরকারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তারা যদি এখন আরও বেশি রক্ষণশীল অবস্থানে চলে যায়, তবে সেটা হবে ধ্বংসাত্মক।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত না হয়ে তারা সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারবে না। ৯০ শতাংশ আফগান দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। তালেবানকে বুঝতে হবে, প্রতিক্রিয়াশীল শাসনে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবন করা যায় না। তাদের কার্যকর প্রশাসন চালাতে গেলে শিক্ষিত, প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি দরকার।

আফগানিস্তান আবার পথের বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা আবার চালু হলে তাদের রসাতলে নিয়ে যাবে।