ঢাকা রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ , ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসরায়েলি ইহুদিদের হামলায় আহত মার্কিন সাংবাদিক

অনলাইন ডেস্ক
৩ ঘন্টা আগে
ইসরায়েলি ইহুদিদের হামলায় আহত মার্কিন সাংবাদিক
দখলকৃত পশ্চিম তীরে বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের সময় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর একজন সাংবাদিক আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ওই হামলায় তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা একদল ফিলিস্তিনি আক্রান্ত হন।

অভিজ্ঞ আলোকচিত্রী সাংবাদিক হেইডি লেভিন দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর হয়ে সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি জানান, কয়েক ডজন বসতি স্থাপনকারীকে তাদের দিকে দৌড়ে আসতে দেখে তার সঙ্গে থাকা ফিলিস্তিনিরা পিছু হটতে শুরু করেন।

একটি ভিডিও বিবৃতিতে লেভিন বলেন, তিনি মাটিতে পড়ে থাকার সময় বসতি স্থাপনকারীরা তাকে আঘাত করে।

লেভিন বলেন, ‘আমার কাছে ক্যামেরার ব্যাগ এবং পাসপোর্ট রাখা একটি ছোট ব্যাগ ছিল। আমার ফোনটি গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলানো ছিল। তারা সেটি ছিঁড়ে ফেলে, আমার ক্যামেরাগুলো কেড়ে ভেঙে ফেলে, ব্যাগটিও নষ্ট করে এবং আমাকে ক্রমাগত লাথি মারতে থাকে।’

তার অনুমান, হামলাটি প্রায় ১০ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ‘পুরো ঘটনাটি ছিল একেবারেই উন্মত্ততাপূর্ণ। আর আমি কাউকে এটি থামানোর চেষ্টা করতে দেখিনি।’

লেভিন আরও বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি না, একজন অভিভাবক কীভাবে এমন দানবকে বড় করতে পারেন। তারা মানুষই নয়, আর হ্যাঁ, তারা ইহুদি সন্ত্রাসী।’

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আর জানেন কী? দুঃখজনকভাবে, তাদের কারও বিরুদ্ধেই বিচারিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত।’

দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, হামলার সময় লেভিনের পোশাকে এমন দৃশ্যমান চিহ্ন ছিল, যা থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছিল যে তিনি একজন সাংবাদিক।

সংবাদমাধ্যমটি এক বিবৃতিতে বলেছে, “নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনরত একজন সাংবাদিকের ওপর এই অন্যায় হামলায় আমরা ক্ষুব্ধ। আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।”

হামলার ভিডিওতে দেখা যায়, মুখোশ পরা একদল বসতি স্থাপনকারী—যাঁদের কয়েকজনের হাতে লাঠি ছিল—একদল ফিলিস্তিনিকে লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ছেন। ফিলিস্তিনিদের মধ্যেও কয়েকজনকে পাথর ছুড়তে দেখা যায়।

ভিডিওর পেছনের অংশে অন্তত পাঁচজন বসতি স্থাপনকারী লেভিনকে ঘিরে ধরেন এবং তাঁকে মাটিতে ফেলে মারধর করেন। এ সময় তিনি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিলেন। হামলাকারীদের তাঁর ব্যাগ ছিনিয়ে নিতে দেখা যায়।

সাংবাদিক জ্যাসপার নাথানিয়েল হামলাটি প্রত্যক্ষ করেন এবং লেভিনকে সাহায্য করেন। শুক্রবার সিএনএনের জিম স্কিউটোর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, ফিলিস্তিনিরা নিচে জলপাই সংগ্রহ করার সময় তাঁরা পাহাড়ের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের মুখোশ পরতে এবং লাঠি হাতে নিতে দেখেছিলেন।

তিনি বলেন, ‘আমি বলতে চাইছি, আমরা তাদের এই হামলার প্রস্তুতি নিতে দেখেছি।’

জলপাই সংগ্রহ শুরু হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর বসতি স্থাপনকারীরা পাহাড় বেয়ে নিচে নেমে এসে পাথর ছুড়তে শুরু করেন বলে তিনি জানান।

নাথানিয়েলের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে ইসরায়েলি সেনারা ঘটনাস্থলে এসে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করেন। এতে তাঁকে ও লেভিনকে পিছু হটতে হয়। তিনি আরও জানান, একটি সাদা পিকআপ ট্রাক পাহাড় বেয়ে দ্রুত নিচে নামার সময় সেটির পেছন থেকে বসতি স্থাপনকারীরা গুলি ছুড়ছিলেন।

পিছু হটার সময় লেভিন হামলাকারীদের কবলে পড়েন বলে নাথানিয়েল জানান। তিনি দেখেন, পাঁচ থেকে ছয়জন বসতি স্থাপনকারী তাঁকে ঘিরে ধরে লাঠি দিয়ে বারবার আঘাত করছেন।

একপর্যায়ে একজন হামলাকারী লেভিনের ভেস্ট ধরে তাঁকে টেনে তোলেন। অন্য একজন তাঁকে আবার লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দেন।

নাথানিয়েল বলেন, ‘আমি আশঙ্কা করছিলাম, তাকে হত্যা করা হবে।’

লেভিনের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করার জন্য তিনি তরুণ ফিলিস্তিনি পুরুষদের কৃতিত্ব দেন। তার ভাষায়, তারা ‘এগিয়ে এসেছিলেন এবং আড়াল দিয়ে সাহায্য করেছিলেন’।

তিনি বলেন, ‘ওই তরুণ ফিলিস্তিনি পুরুষেরা যদি পাথর না ছুড়তেন, তাহলে হেইডি মারা যেতে পারতেন। আর আমি তাঁর কাছে পৌঁছাতেও পারতাম না।’

হামলার পর হাসপাতালে লেভিনকে দেখতে গিয়েছিলেন নাথানিয়েল। তিনি জানান, লেভিনের একটি পাঁজরের হাড় ভেঙেছে, মেরুদণ্ডের একটি কশেরুকা ভেঙেছে এবং আঙুলে গুরুতর আঘাত লেগেছে, যার জন্য অস্ত্রোপচার প্রয়োজন।

প্যালেস্টাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, বসতি স্থাপনকারীদের মারধরে আহত দুজনকে তারা চিকিৎসা দিচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ৬৩ বছর বয়সী এক নারী এবং ৪০ বছর বয়সী এক পুরুষ।

ফিলিস্তিনিদের বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ওই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা বেড়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

গত বছরও পশ্চিম তীরজুড়ে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে এ ধরনের হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। সে সময় বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়েছিলেন এবং তাঁদের নিজেদের জমিতে প্রবেশে বাধা দিয়েছিলেন।

হামলার পর লেভিনকে দ্রুত রামাল্লা সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশন (এফপিএ) জানিয়েছে, হাসপাতালে তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল ছিল। প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা লেভিনের হাত ও পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা রয়েছে।

সাংবাদিকদের সংগঠনের নিন্দা

ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশন এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সংগঠনটি বলেছে, ‘অজুহাত দেওয়া বন্ধ করুন এবং এই সহিংস জনতার হাত থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করুন।’

এক বিবৃতিতে এফপিএ বলেছে, ‘দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সাংবাদিক ও অন্যান্য বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো ধারাবাহিক সহিংস হামলার সর্বশেষ ঘটনা এটি। আইনহীনতা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমরা বারবার আহ্বান জানিয়েছি। কিন্তু ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আমাদের সেই আহ্বান উপেক্ষা করেছে।’

ঘটনাস্থলের আরও কিছু ভিডিওতে হামলার পর রক্তাক্ত মুখে এক ব্যক্তিকে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে ফিলিস্তিনি নম্বরপ্লেটযুক্ত একটি গাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়।

আরেকটি ভিডিওতে ইসরায়েলি সেনাদের সড়ক অবরোধ করতে দেখা যায়। একজন সেনা মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। অন্য একজনকে ধোঁয়া সৃষ্টিকারী গ্রেনেডের মতো একটি বস্তু ছুড়তে দেখা যায়। এ সময় এক ব্যক্তি তাকে অনুরোধ করে বলছিলেন, ‘দয়া করে এটা করবেন না!’

হামলার বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর ইসরায়েলি পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।

এক বিবৃতিতে পুলিশ জানায়, ‘আমরা যেকোনো ধরনের সহিংসতাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখি, বিশেষ করে যখন সংবাদমাধ্যমের সদস্যরা তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এর শিকার হন।’

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তারা ঘটনাটির ‘সব পরিস্থিতি’ খতিয়ে দেখবে।

আইডিএফের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা ওই অঞ্চলের নিরাপত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা ও সহিংসতা গুরুতর এবং অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ড।’

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অতীতে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে একটি বিচ্ছিন্ন উচ্ছৃঙ্খল গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এবারও তিনি হামলার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ঘটনাটি নিয়ে‘গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে’।

তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল ‘যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সহিংসতার নিন্দা জানায়’। তবে হামলায় জড়িত মুখোশধারী ও সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে তিনি সরাসরি কোনো নিন্দা জানাননি।

আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট অবশ্য লেভিনের ওপর হামলাকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড  ‘একটি সমগ্র জাতির মর্যাদায় কলঙ্ক লেপন করে’।

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ জানান, ইহুদিদের সাপ্তাহিক বিশ্রামের দিন সাবাথ শেষ হওয়ার পর শনিবার তিনি লেভিনকে ফোন করেছিলেন।

হারজগ বলেন, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি এই ন্যক্কারজনক ও মর্মান্তিক সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানাই। আপনার ওপর চালানো ভয়াবহ হামলা এবং তাইয়েবায় আজ ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো অন্যান্য গুরুতর সহিংসতাও এর অন্তর্ভুক্ত।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাবাথজুড়ে বিষয়টি আমার বিবেককে গভীরভাবে ভারাক্রান্ত করেছে। আপনি যা সহ্য করেছেন, তার জন্য আমি গভীর দুঃখ প্রকাশ করছি এবং আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি। এই হামলার অপরাধীদের ঘৃণ্য আচরণ ইসরায়েলের নাগরিকদের কিংবা রাষ্ট্রের মূল্যবোধকে প্রতিনিধিত্ব করে না।’

ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি এটিকে ‘মুখোশধারী কাপুরুষদের সংঘটিত ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড” এবং ‘অর্থহীন সহিংসতার লজ্জাজনক ঘটনা’ বলে অভিহিত করেন।

হাকাবি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, হামলায় অংশগ্রহণকারীদের গ্রেপ্তার এবং আইনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের বিচারের আহ্বান জানান।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, কনস্যুলার সহায়তার প্রস্তাব দিতে তারা দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ‘ওই ছবিগুলো এবং আমরা যা দেখছি, তা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’।

রুবিও বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলিদের এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলেছি এবং এখনো বলে যাচ্ছি।’

সাংবাদিকেরা জানতে চান, হামলা নিয়ে প্রশাসনের উদ্বেগের সঙ্গে ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের শুরুতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জবাবে রুবিও বলেন, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অর্থ বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে সমর্থন করা নয়।

ট্রাম্পের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি এখন যা ঘটছে, তা দেখতে চান না। নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে, টেলিভিশনে তিনি এখন যা দেখছেন কিংবা সংবাদে যা পড়ছেন, তিনি সেটিকে সমর্থন করেন।’


কমেন্ট বক্স