ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ , ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বই পড়া কি আবারও হয়ে উঠছে তরুণদের ফ্যাশন?

অনলাইন ডেস্ক
২ ঘন্টা আগে
বই পড়া কি আবারও হয়ে উঠছে তরুণদের ফ্যাশন?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ক্রল করতে করতেই কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ছোট ভিডিও আর নানা কনটেন্টের ভিড়ে দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়ার অভ্যাস যেন হারিয়ে যেতে বসেছিল।
তবে সেই চিত্রে পরিবর্তন আসছে। তরুণদের মধ্যে আবারও বাড়ছে বই নিয়ে আগ্রহ। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে পাঠচক্রে যোগ দিচ্ছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পছন্দের বই নিয়ে আলোচনা করছেন। আবার তারকাদের বইয়ের সুপারিশও নতুন পাঠক তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
 
ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য এসেছে।
 
বই পড়া এখন আর শুধু একা বসে পাতা উল্টানোর অভ্যাস নয়। এটি হয়ে উঠছে মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার, নিজের পছন্দ ভাগ করে নেওয়ার এবং নতুন একটি সম্প্রদায়ের অংশ হওয়ার মাধ্যম। বই পড়ার এই নতুন সংস্কৃতি তরুণদের কাছে বইকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলছে।
 
পাঠচক্রে বাড়ছে তরুণদের আগ্রহ
 
একই জায়গায় বসে নিজের পছন্দের বই পড়া, বই বিনিময় করা কিংবা পড়া শেষে বই নিয়ে আলোচনা—এমন নানা আয়োজনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে বিভিন্ন শহরে। দিল্লির ‘লোধি রিডস’-এর মতো পাঠচক্রে মানুষ একত্র হয়ে নীরবে বই পড়েন। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ‘বুক ডুফ’ নামের একটি পাঠকগোষ্ঠী নীরব পাঠের পাশাপাশি বই বিনিময়ের আয়োজনও করে।
 
বই পড়ার এমন আয়োজনের পেছনে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের আকাঙ্ক্ষাও কাজ করছে। দিল্লির একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক ও পাঠক কার্তিক চৌহানের মতে, শহুরে জীবনে একাকিত্ব বাড়ার সঙ্গে এ ধরনের উদ্যোগের সম্পর্ক রয়েছে।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভরতা বাড়ার এই সময়ে মানুষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বই প্রচারক ও ‘বাবেলফিশ বুক ক্লাব’-এর কিউরেটর শিবানি কৌলের মতে, বই পড়ার সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যুক্ত হলে পুরনো পাঠকরা নতুন করে উৎসাহ পান। পাশাপাশি যারা আগে নিয়মিত বই পড়তেন না, তারাও বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।
 
তারকাদের বইয়ের সুপারিশে নতুন পাঠক
 
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন বইয়ের প্রচার ও পাঠক তৈরির অন্যতম মাধ্যম। ‘বুকটক’ ও ‘বুকস্টাগ্রাম’-এর মতো অনলাইন পরিসরে পাঠকেরা বইয়ের পর্যালোচনা, পছন্দের উদ্ধৃতি এবং ভবিষ্যতে পড়তে চান এমন বইয়ের তালিকা ভাগ করে নেন।
 
জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী দুয়া লিপাও নিজের ‘সার্ভিস৯৫ বুক ক্লাব’-এর মাধ্যমে নিয়মিত বইয়ের সুপারিশ করেন। তার পছন্দের বই নিয়ে ভক্তদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়। ফলে যারা আগে বই পড়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহী ছিলেন না, তারাও নতুন লেখক ও বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।
 
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া প্রতিটি বই সবার জন্য সমান উপযোগী নয়। বইয়ের বিষয়বস্তু, ভাষা ও জটিলতা সম্পর্কে জেনে নিজের আগ্রহ অনুযায়ী বই বেছে নেওয়া জরুরি।
 
ফ্যাশনেও জায়গা করে নিচ্ছে বই
 
বই পড়ার আগ্রহ এখন ফ্যাশনজগতেও প্রভাব ফেলছে। ২০২৬ সালের নিউইয়র্ক ফ্যাশন উইকে কোচের প্রদর্শনীতে তারকাদের ব্যাগে ছোট বইয়ের আকৃতির অনুষঙ্গ দেখা যায়। পেঙ্গুইন র‍্যান্ডম হাউসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি এসব ক্ষুদ্রাকৃতির বইয়ের অনুষঙ্গ বইয়ের প্রতি ভালোবাসাকে ফ্যাশনের অংশ করে তুলেছে।
 
অন্যদিকে, ডিওরের মতো ফ্যাশন ব্র্যান্ডও ক্ল্যাসিক বইয়ের নকশা থেকে অনুপ্রাণিত ব্যাগ তৈরি করেছে। অনলাইনেও বইয়ের পাতার সঙ্গে ছোট ব্যাগের মতো অনুষঙ্গ যুক্ত করে নতুন ধরনের নকশা তৈরি করছেন অনেকে।
 
এসব প্রবণতা দেখাচ্ছে, বই এখন শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; ব্যক্তিগত রুচি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রকাশের উপায় হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে।
 
বই পড়ার অভ্যাস গড়তে অভিনব উদ্যোগ
 
বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে। ভারতের কয়েকটি বিমানবন্দরে চালু হয়েছে ‘ফ্লাইব্রেরি’। এই উদ্যোগের আওতায় যাত্রীরা নির্ধারিত স্থান থেকে বিনামূল্যে বই নিতে পারেন, যাত্রাপথে পড়তে পারেন এবং গন্তব্যে পৌঁছে অংশগ্রহণকারী অন্য বিমানবন্দরে বইটি ফেরত দিতে পারেন।
 
সিঙ্গাপুরে প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট বই পড়ার জন্য পাঠকদের ভার্চ্যুয়াল কয়েন দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ মানুষের ব্যস্ত জীবনে বই পড়ার জন্য সময় বের করতে উৎসাহিত করছে।
 
বই বিক্রেতাদের অভিজ্ঞতাতেও তরুণ পাঠকের আগ্রহের চিত্র উঠে এসেছে। দিল্লির ফকির চাঁদ অ্যান্ড সন্স বইয়ের দোকানের চতুর্থ প্রজন্মের বই বিক্রেতা অভিনব বামহির মতে, ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ক্রেতাদের উপস্থিতি বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বই ও লেখকদের পরিচিতি বাড়ায় অনেকেই প্রথমবারের মতো বই কিনছেন। হিন্দি ও উর্দু সাহিত্যের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে কবিতা ও শায়েরির ভিডিও দেখে অনেকে সংশ্লিষ্ট লেখকদের বই খুঁজছেন।
 
তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো বই জনপ্রিয় হলে অনেকে বইটির বিষয়বস্তু না জেনেই সেটি কিনে ফেলেন। ফলে জনপ্রিয়তার পাশাপাশি বই সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
 
বই পড়া কি সত্যিই আবার ফ্যাশন?
 
বই পড়া কখনোই ফ্যাশনের বাইরে ছিল না—এমনটাই মনে করেন বই নিয়ে কাজ করা অনেকে। তবে যেসব পরিবারে বই পড়ার চর্চা নেই, সেসব পরিবারের তরুণদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি ভিডিও, তারকার সুপারিশ কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে পাঠচক্রে অংশ নেওয়া বইয়ের জগতে প্রবেশের প্রথম সুযোগ হতে পারে।
বই পড়ার এই নতুন প্রবণতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয় কোনো বই দ্রুত আলোচনার বাইরে চলে যেতে পারে। তবে সেই আগ্রহ থেকে কেউ যদি নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন, সেটিই হবে সবচেয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন।
 
হয়তো বই পড়ার ধরন বদলেছে, বদলেছে পাঠকদের একত্র হওয়ার পদ্ধতিও। কিন্তু বইয়ের পাতায় নতুন জগৎ আবিষ্কারের আনন্দ এখনো একই রকম। আর সেই আনন্দই নতুন প্রজন্মকে আবার বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনতে পারে।


কমেন্ট বক্স