1. banglalivedesk@gmail.com : banglalive :
  2. emonbanglatv@gmail.com : Dewan Emon : Dewan Emon
  3. emonnagorik@gmail.com : Rajbari Correspondent : Rajbari Correspondent
এক মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
শনিবার, ১৯ জুন ২০২১, ০৫:১৪ পূর্বাহ্ন

এক মহানায়কের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

এম.পলাশ শরীফ, বাগেরহাট করেসপন্ডেন্ট । বাংলালাইভ২৪.কম
  • আপডেট সময় শনিবার, ৯ জানুয়ারী, ২০২১

১০ জানুয়ারি। বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। বাংলার ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য নাম, অবিসংবাদিত নেতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস।

এ যে এক অন্যরকম অনুভুতির দিন। পুরা জাতির জন্য উৎকণ্ঠার, আবেগঘন, অপেক্ষমাণ, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলানো এক দিন। কখন আসবেন তিনি! কখন দেখবো তেজস্বিনী ঐ মুখখানি। সেদিন বাতাসে ছিল মুক্তির বারতা। প্রথমত পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি, দ্বিতীয়ত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। যে সংবাদ ছিল অবিশ্বাস্য এবং হৃদয় স্পন্দন ছিল স্বপ্নময়তায় ভরা। মুহুর্তেই যার ব্যপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল সুরের মুর্ছনার মতো সাড়ে সাত কোটি বাঙালির হৃদয়ে , বিশ্ববাসীর দুয়ার প্রান্তে এবং বাংলা মাতার অন্তরের অন্তরস্থলে। পৌঁছে গিয়েছিল যে সংবাদ বাংলা প্রকৃতির প্রতিটি জীবের কর্ণ গহ্বরে।

প্রাণের চেয়ে প্রিয় নেতার মুক্তির সংবাদে সাড়ে সাত কোটি বাঙালি ১৯৭২ সালের এই দিনে আনন্দাশ্রæতে সিক্ত হয়ে জয়বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে বাংলার আকাশ-বাতাস, মাঠ-প্রান্তর প্রকোম্পিত করে তুলেছিল। সুদীর্ঘ সাড়ে নয় মাস নিদ্রাহীন অশ্রæশূন্য নিঃষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে অপেক্ষমাণ বাংলা মাতা তাঁর সাত রাজার ধন, বুকের মানিক, আদরের খোকাকে কাছে পাবে জেনে ছলছল চোখে অধির উন্মাদনার প্রহর গুনছিল। বাংলা প্রকৃতি সেদিন নবরূপে সেজেছিল তার প্রিয় সখাকে সংবর্ধনা জানাতে।

সেদিন বৃক্ষরাজি তাদের প্রিয় সখাকে ছায়া দিতে, দুর্বাদল পদদলিত হতে, ঝর্ণা রাশি শীতল করতে, বেলি, বকুল, রজনীগন্ধা তাদের সবটুকু সুবাস বিলিয়ে দিতে আকুল হয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। সেই দিনের সেই মহেন্দ্রক্ষণ বর্ণনাতীত। তাছাড়া আমি তো সেদিনকার ছেলে মাত্র। পিতার মুখে শুনেছি বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস, যা আমার লেখনিতে বিন্দুসম বোঝানো সম্ভব নয়। একজন মানুষ বাঙালির হৃদয়ে ও মস্তিষ্কে তাঁর মুগ্ধতা দিয়ে কতটা জায়গা করে নিলে মাত্র তাঁর একটি ভাষণেই পরাজয়, মৃত্যুভয় সবকিছু উপেক্ষা করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং তাঁর নির্দেশনা মতেই বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে যুদ্ধ করেছিল।

পাকিস্তানের শাসন, শোষণ, অত্যাচার ও নির্যাতনের হাত থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করতে স্বাধীনতা ও স্বাধিকার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সারাটা জীবন তিনি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য সংগ্রাম করেছেন। নিজের দুঃখ কষ্টকে তুচ্ছ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য, এই মা মাটি মানুষের মঙ্গলের জন্য দিনের পর দিন জেল খেটেছেন, অত্যাচার, নির্যাতন, জুলুম ভোগ করেছেন যিনি, তিনি যে বিধাতার এক বিস্ময় সৃষ্টি, এক বিস্ময় নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি যে দেশ ও মানবপ্রেমী, সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক, জনদরদী, নিরহংকার, অনাড়ম্বর, জ্ঞান সুগভীর, হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বাঙালির সব আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে উঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। ভূষিত হন বঙ্গবন্ধু উপাধিতে।

আন্দোলন সংগ্রামের চুড়ান্ত পর্যায়ে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালিন রেসকোর্স ময়দানে বাঙালি জাতির উদ্দেশ্যে স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রস্তুতি নেয়ার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বলেন-“ প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রæর মোকাবিলা করতে হবে। মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দিব, এদেশের মানুষের মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।” কিন্তু কুচক্রী ষড়যন্ত্রকারী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খানের নীচ ও জঘন্য পরিকল্পনায় ২৫ মার্চের মধ্যরাতে পাকিস্তানি বর্বর হানাদার বাহিনি ঘুমন্ত নিরস্ত্র, নিরাপরাধ বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শুরু করে নির্বিচারে নির্মম হত্যাযজ্ঞ ।

ঐ রাতেই ঢাকায় হত্যা করা হয় হাজার হাজার বাঙালিকে। আর সেই রাতেই গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানিতে নিয়ে যাওয়া হয় বাঙালির প্রাণের নেতা, বাঙালির অভিভাবক, স্বাধীনতার সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ধানমন্ডি বাসভবন থেকে ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে স্বাধীনতার ডাক দেন তিনি। ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। শুরু হলো বাঙালির স্বশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ও নির্দেশিত পথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে যান।

যতই দিন অতিবাহিত হয়, যতই ঝরতে থাকে রক্ত, স্বদেশের মাটি থেকে পাক হানাদার বাহিনী মুক্ত করতে বাঙালি ততই মরিয়া হয়ে ওঠে। মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর দ্বিমুখী প্রতিরোধের মুখে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনী আত্ম সমর্পন করতে বাধ্য হয়। দীর্ঘ নয় মাসের স্বাধীনতা সংগ্রামে ত্রিশ লক্ষ শহিদ ও দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ডিসেম্বর স্বাধীন হয় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।

কিন্তু তখনও শঙ্কা কাটেনি বাঙালি জাতির। কারণ যার নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হয়েছে তিনি তখনও পাকিস্তানের অন্ধকার নির্জন কারাগারে বন্দী। লাহোরের লায়ালপুর কারাগার। বর্তমানে যে স্থানটির নাম ফয়সালাবাদ। যে কারাগার ছিল বিভৎস যন্ত্রণার প্রতিমুর্তি তথা পাকিস্তানের জাহান্নাম। এটা ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে উষ্ণতম স্থান। গ্রীষ্মে যেখানে তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ছাপিয়ে যায়। বন্দিদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। বাঙালির প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে আটক রাখা হয় এই কারাগারের এক নিঃসঙ্গ সেলে। গরমে তেতে ওঠা সেই কারাকক্ষে কোনো পাখাও ছিল না। প্রচন্ড গরমের দাবাদহের দুঃসহ নির্মম যন্ত্রণা সহ্য করে তাঁকে সাড়ে নয় মাস অর্থাৎ ২৮৮ দিন অর্থাৎ ৬৯১২ ঘণ্টা অর্থাৎ ৪,১৪,৭২০ মিনিটের প্রতিটি মুহূর্ত অতিবাহিত করতে হয়েছে। তাঁকে দেওয়া হয় প্রাণের হুমকি, নিয়ে যাওয়া হয় ফাসির মঞ্চে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে মানসিকভাবে পিষ্ট করা। যাতে তিনি পাগল হয়ে যান। কিন্তু তিনি সবকিছুই মোকাবিলা করলেন অদম্য সাহস ও অপরিসীম মনোবল দ্বারা। মানুষ কতটা অমানুষ, নির্দয়, পাষÐ হলে , বুকের পাটায় কতটা দুঃসাহস থাকলে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মধ্যমণির সাথে, বাংলার কোটি প্রাণের স্পন্দনের সাথে এমনটি করতে পারে!

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিশ্ববাসী বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে থাকে। বাঙালির পাশাপাশি বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে অবশেষে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন পাকিস্তান। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তাকে হেলিকাপ্টারে লন্ডনে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে ভারত হয়ে ১০ জানুয়ারি মুক্ত স্বাধীন স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন তিনি। স্বাধীন বাংলার নতুন সূর্যালোকে সূর্য়ের মত চির ভাস্কর উজ্জ্বল বাংলাদেশের নির্মাতা, ইতিহাসের মহানায়ক ফিরে আসেন তাঁর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে, ফিরে আসেন বাংলা মায়ের কোলে।

আবেগে আপ্লুত বাংলা মাতা পরম স্নেহে দু’হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিলেন তার অতি আদরের খোকাকে। এদিকে বাংলার দামাল ছেলেরা, বাংলার মুক্তি সেনারা, বাংলার কৃষক, বাংলার হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, কামার, কুমার, তাতি, জেলে সহ সকল পেশার মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে একটি বার দেখার জন্য রেসকোর্স ময়দান পরিণত হলো জনসমূদ্রে। স্বদেশের মাটিতে পা রেখে বাংলার মানুষের এ ভালবাসা দেখে মানবতার প্রতিমুর্তি, জনদরদী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলেন।

আনন্দ বেদনার অশ্রু ঝরলো তাঁর দু’চোখ বেয়ে। প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষ সেদিন আনন্দাশ্রুতে সিক্ত হয়ে জয়বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু ধ্বনিতে বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলেছিল। রেসকোর্সে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন-“যে মাটিকে ভালবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় আমি যেতে পারব কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি, বাংলার ভাইদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।” ওগো জগৎ শ্রেষ্ঠ বাঙালি, ওগো বাঙালির প্রিয় নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তোমাকে জানাই আমার সশ্রদ্ধেয় সালাম। তোমাকে জানাই স্যালুট।

লেখক : অসীম কুমার সরকার, সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার। মোরেলগঞ্জ, বাগেরহাট।

এ জাতীয় আরো খবর

সতর্কতা

বাংলালাইভ২৪.কমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

© All rights reserved © 2019 BanglaLive24
Theme Developed BY ThemesBazar.Com
themesbazarbanglalive1