ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘বিরোধীদলে থাকতেই কবর দিতে বাধা, ক্ষমতায় গেলে কী করবেন’

অনলাইন ডেস্ক
৪ ঘন্টা আগে
‘বিরোধীদলে থাকতেই কবর দিতে বাধা, ক্ষমতায় গেলে কী করবেন’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা অভিযোগ করেছেন, নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের কথা বললেও অন্যদের বেলায় তা মানতে নারাজ জামায়াতে ইসলামী। পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বিরোধীদলে থাকতেই যদি কাউকে নিজের বসতভিটায় দাফনে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেলে কী করা হবে?

সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা লেখেন তাসনিম জারা।

পোস্টে তিনি লেখেন, সমাজে কেউ মারা গেলে তার দাফনের জন্য কবর খুঁড়তে সাধারণত কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে এলাকার তরুণেরা কোদাল নিয়ে এগিয়ে আসেন। কেউ বাঁশ সংগ্রহ করেন, কেউ চাটাই নিয়ে আসেন। মৃত ব্যক্তির দাফনে দেরি করা উচিত নয় এমন শিক্ষা নিয়েই মানুষ বড় হয়।

তাসনিম জারা লেখেন, গত শনিবার সকাল ১০টার দিকে ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী মারা যান। এরপর সারাদিন তার পরিবারকে মরদেহ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করতে হয়। তার অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেন এবং মাইক ও ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে জানান, মানিক পশারীকে পিরোজপুরে দাফন করতে দেওয়া হবে না।

তিনি আরও লেখেন, প্রথমে বাড়িতে একটি কবর খোঁড়া হলেও মানিক পশারীর মেয়ে সীমু আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন এসে সেটি ভরাট করে দেন। পরে ফুফুদের সঙ্গে নিয়ে সীমু আক্তার আবার কবর খনন করেন। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় অন্য কেউ কবর খুঁড়তে এগিয়ে আসেননি। ফলে যে কাজ সাধারণত প্রতিবেশীদের করার কথা, তা করতে হয়েছে মৃত ব্যক্তির মেয়ে ও বোনদের।

তাসনিম জারার ভাষ্য অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত মধ্যরাতের পর পুলিশি পাহারায় ওই কবরে মানিক পশারীকে দাফন করা হয়। পরিবারের সদস্যদের বাইরে সেখানে আর কেউ উপস্থিত ছিলেন না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পোস্টে তাসনিম জারা মানিক পশারীকে সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, দাফনের আগে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের এক সহকারী সেক্রেটারি মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন। একই সঙ্গে তাকে গার্ড অব অনার দিতে এবং পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না বলেও বক্তব্য দেন বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তাসনিম জারা। দাফনের পর ওই নেতার পক্ষ থেকে জামায়াতের নেতারা ‘লাশের রাজনীতি করেন না’ বলে মন্তব্য করার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে তাসনিম জারা বলেন, এ ধরনের বিষয়ে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আদালত রয়েছে। কিন্তু তার অভিযোগ, জামায়াতের নেতাকর্মীরা বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি করার পরিবর্তে দাফনে বাধা দিয়ে এবং মাইক হাতে ঘোষণা দিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন।

তিনি লেখেন, বাংলাদেশে জানাজার আগে মৃত ব্যক্তির স্বজনেরা মানুষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মৃত্যুর পর মানুষের হিসাব-নিকাশ শেষ হয়ে যায় এমন বিশ্বাস থেকেই মানুষ ক্ষমা করে দেয়; বাকি বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেয়। কিন্তু মানিক পশারীর ক্ষেত্রে তার পরিবার সেই সামাজিক রীতি পালনের সুযোগও পায়নি বলে মন্তব্য করেন তাসনিম জারা।

নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে কাউকে দাফন করতে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে অন্যদের এমন কর্তৃত্ব দেখানোরও সমালোচনা করেন তিনি। তার মতে, ‘পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না’এ ধরনের বক্তব্য এমন ধারণা দেয়, যেন ওই এলাকার মাটির ওপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একক অধিকার রয়েছে।

তাসনিম জারা আরও লেখেন, একসময় জামায়াত-শিবিরকে উদ্দেশ করে ‘রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’ ধরনের স্লোগান দেওয়া হতো। এমন বক্তব্য যে অন্যায়, তা জামায়াতের নেতাকর্মীদের বোঝার কথা। কিন্তু ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা সেই অন্যায়ের বিষয়টি ভুলে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল উল্লেখ করে তাসনিম জারা প্রশ্ন তোলেন, সেই দলের নেতাকর্মীরা এখন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন এবং কার কবর কোথায় হবে তা নির্ধারণ করতে চাইছেন কেন?

পোস্টের শেষাংশে তিনি বলেন, জামায়াত নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও মানবিক মর্যাদার কথা বললেও অন্যদের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করছে না। ভোটের আগে ও বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলার সঙ্গে একজন মৃত ব্যক্তি ও তার শোকাহত পরিবারের প্রতি আচরণের এই বৈপরীত্য তুলে ধরে তিনি প্রশ্ন করেন, বিরোধীদলে থাকতেই যদি নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দেওয়া হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা হাতে পেলে কী করা হবে?


কমেন্ট বক্স