ইসরায়েলে আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পার্লামেন্ট নির্বাচন। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াই এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা ঘিরে এবারের ভোটে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে ভোটের পরও দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বার্তা সংস্থা আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটতে পারে। তবে কোনো দল বা জোট প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে ইসরায়েলকে আবারও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
গাজা, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং গত চার বছর ধরে কট্টর ডানপন্থি ও ধর্মীয় জোটের শাসন—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোটের ফল ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত জরিপগুলো সঠিক হলে, ২০২২ সালের নির্বাচনের পর থেকে নেতানিয়াহুর জনসমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন তাঁর জন্য কঠিন হতে পারে। এমনকি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান গাদি আইজেনকটের চেয়েও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পিছিয়ে থাকতে পারেন তিনি। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এখনো নেতানিয়াহুর আবারও ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো গিডিওন রাহাতের মতে, নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় টিকে থাকার পেছনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সমর্থকগোষ্ঠী কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান থেকে অব্যাহতি পাওয়া অতি-ধর্মীয় গোষ্ঠী, বসতি সম্প্রসারণ ও পশ্চিম তীরকে কার্যত সংযুক্ত করার আদর্শিক লক্ষ্য অনুসরণকারী কট্টর ডানপন্থিরা এবং নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত সমর্থকেরা।
রাহাতের ভাষ্য, নেতানিয়াহু নিজের চারপাশে ব্যক্তিপূজার মতো একটি পরিবেশ গড়ে তুলেছেন। তাঁর সমর্থকদের মধ্যে এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে ইসরায়েল পরিচালনার যোগ্য একমাত্র ব্যক্তিই তিনি। এমনকি নেতানিয়াহু নিজেকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সঙ্গে এক করে দেখেন বলেও মনে করেন এই বিশ্লেষক।
রাহাত আরও বলেন, ইসরায়েলের রাজনীতিতে পরিচয়ভিত্তিক অবস্থান এতটাই প্রভাবশালী যে সামরিক ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা ভোটারদের অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি। তাঁর সমর্থকদের একাংশ বিশ্বাস করেন, দেশটির প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে থাকা একটি ‘গভীর রাষ্ট্র’ তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করছে। একই সঙ্গে ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য তাঁকে এককভাবে দায়ী করা যায় না বলেও তাঁরা মনে করেন।
বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন রাইনহোল্ডের মতে, নেতানিয়াহু ইসরায়েলের ইতিহাসে অন্যতম দক্ষ রাজনীতিক। প্রতিদ্বন্দ্বীদের কৌশলে পরাস্ত করার পাশাপাশি জনসমক্ষে নিজের ভাবমূর্তি তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তিনি অন্য রাজনীতিকদের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেন।
তবে গত চার বছরে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি ও ধর্মীয় জোটের নীতিতে বহু ইসরায়েলি হতাশ হয়েছেন। বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগকে অনেকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, সেনাবাহিনীতে জনবলের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও অতি-ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্যদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ নিশ্চিত করা যায়নি। এ সময় ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের মতো কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রীরাও নিজেদের আদর্শিক লক্ষ্য এগিয়ে নিয়েছেন।
রাইনহোল্ডের আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আবারও প্রধানমন্ত্রী হলে এসব সমস্যা আরও গভীর হতে পারে এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে। এর ফলে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক নাগরিকের মধ্যে হতাশা বাড়তে পারে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতা হারানোর ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকার পর তিনি ক্ষমতা হারান। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সরকার গঠন নিয়ে অস্থিরতার কারণে ইসরায়েলে চার দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বাধীন জোট তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়।
এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতির অভিযোগে চলমান বিচার এবং দীর্ঘদিনের বিভিন্ন কেলেঙ্কারি। নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে সাফল্যের দাবিদার এই নেতাকে যুদ্ধ পরিচালনায় ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা এবং জোটসঙ্গীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগেরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলায় ছায়া ক্রিপ্টো অর্থনীতি গড়ে তোলার কথা বলেও সম্প্রতি আলোচনায় এসেছেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনও নেতানিয়াহুর নির্বাচনী অবস্থান শক্তিশালী করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে না বলে জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজের ১৮ অক্টোবরের ঘোষণার পরদিন পরিচালিত এক জরিপে ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, ট্রাম্পের সমর্থন তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আনবে না। ১৭ শতাংশ বলেন, এ সমর্থনের কারণে নেতানিয়াহুকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা কমেছে। অন্যদিকে, ১২ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, ট্রাম্পের সমর্থন তাঁদের লিকুদ পার্টিকে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় করেছে।
একই জরিপে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আইজেনকটের প্রতি সমর্থন ছিল ৪৫ শতাংশ, যেখানে নেতানিয়াহুর পক্ষে ছিলেন ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা। জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিদায়ী পার্লামেন্টে ৩২টি আসন থাকা নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবার ২১টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, আইজেনকটের ইয়াশার পার্টির সম্ভাব্য আসন ধরা হয়েছে ২৪টি।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উদি সোমারের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিরোধী দলগুলোর সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করছে। ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য নেতানিয়াহুর পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগের ঘাটতি নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। সোমারের মতে, একসময় পার্লামেন্টে ২৪টি আসন থাকা লাপিদের দল এবার মাত্র দুটি আসন পেতে পারে।
জরিপে নেতানিয়াহুর সমর্থন কমে আসার পাশাপাশি ডানপন্থি জোটের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধও ভোটারদের অসন্তোষের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বিরোধীরা এই অসন্তোষকে কার্যকর রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে পারেনি। কোনো জরিপেই একক দল বা জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত না হওয়ায় নির্বাচনের ফল নিয়ে আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সতর্ক বিশ্লেষকেরা।
নির্বাচনের পর সম্ভাব্য পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে নেতানিয়াহু ও আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন দুই বৃহত্তম দলের মধ্যে মধ্যপন্থি জোট গঠন। আরেকটি সম্ভাবনা হলো, ২০২৭ সালের শুরুর দিকে নতুন নির্বাচন আয়োজন। উভয় পরিস্থিতিতেই নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় হয়ে উঠবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ভোটের ফল, বিরোধীদের অবস্থান এবং সরকার গঠনের সমীকরণই নির্ধারণ করবে ইসরায়েলের রাজনীতিতে তাঁর ভবিষ্যৎ।
সূত্র : টাইমস অব ইসরায়েল ও আনাদোলু এজেন্সি।