ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্বল্প আয়েও স্বস্তিতে চলার ৭টি সহজ বাজেট কৌশল

অনলাইন ডেস্ক
২ ঘন্টা আগে
স্বল্প আয়েও স্বস্তিতে চলার ৭টি সহজ বাজেট কৌশল
মাসের শুরুতে বেতন হাতে এলেও কয়েক দিনের মধ্যেই অনেকের বাজেট এলোমেলো হয়ে যায়। বাড়িভাড়া, বাজার, যাতায়াত, চিকিৎসা ও পরিবারের অন্যান্য খরচ সামলাতে গিয়ে মাসের শেষ দিকে টানাটানি শুরু হয়। বিশেষ করে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য প্রতিদিনের ব্যয় মেটানো বড় চ্যালেঞ্জ। তবে আয় কম হলেও পরিকল্পিতভাবে টাকা খরচ করতে পারলে আর্থিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব। এ জন্য প্রথমেই বুঝতে হবে, কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে।

১. আয় ও ব্যয়ের হিসাব রাখুন

সঠিক বাজেট তৈরির প্রথম ধাপ হলো মাসিক আয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা। বেতনের পাশাপাশি অন্য কোনো উৎস থেকে আয় থাকলে সেটিও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। এরপর অন্তত এক মাসের সব খরচ লিখে রাখুন। চায়ের দোকানের সামান্য খরচ থেকে শুরু করে বাড়িভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল—কোনো কিছুই বাদ দেবেন না।

হিসাব রাখার জন্য খাতা, মোবাইলের নোট কিংবা স্প্রেডশিট ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে কোন খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হচ্ছে, তা সহজে বোঝা যাবে।

খরচকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। নির্দিষ্ট খরচের মধ্যে রয়েছে বাড়িভাড়া, ঋণের কিস্তি ও স্কুলের বেতন। অন্যদিকে বাজার, যাতায়াত, মোবাইল রিচার্জ ও চিকিৎসার মতো ব্যয় মাসভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।

২. প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিন

ব্যক্তিগত বাজেট তৈরির পরিচিত একটি পদ্ধতি হলো ৫০/৩০/২০ নিয়ম। এ পদ্ধতিতে আয়ের ৫০ শতাংশ প্রয়োজনীয় খরচে, ৩০ শতাংশ বিনোদন ও ব্যক্তিগত পছন্দের খাতে এবং বাকি ২০ শতাংশ সঞ্চয় বা ঋণ পরিশোধে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

তবে সীমিত আয়ের ক্ষেত্রে এই অনুপাত অনুসরণ করা সব সময় সম্ভব নয়। অনেকের আয়ের বড় অংশই প্রয়োজনীয় খরচে চলে যায়। সে ক্ষেত্রে ৬০/৩০/১০ কিংবা ৭০/২০/১০-এর মতো বিকল্প অনুপাত বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ, নিজের আয় ও ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে বাজেট তৈরি করতে হবে।

একসঙ্গে ২০ শতাংশ সঞ্চয় করা সম্ভব না হলে ৫ শতাংশ দিয়ে শুরু করুন। অল্প অল্প করে নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ।

৩. অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনুন

ছোট ছোট খরচ নিয়মিত হতে থাকলে মাস শেষে তা বড় অঙ্কে দাঁড়ায়। তাই কোথায় খরচ কমানো সম্ভব, তা খুঁজে বের করা জরুরি।

অব্যবহৃত সাবস্ক্রিপশন বাতিল করুন: যেসব প্যাকেজ বা সেবা ব্যবহার করছেন না, সেগুলোর জন্য নিয়মিত টাকা দেওয়া বন্ধ করুন।

বাইরে খাওয়া কমান: ঘরে রান্না করে খেলে অনেক ক্ষেত্রে খাবারের খরচ সাশ্রয় করা সম্ভব।

হুট করে কেনাকাটা এড়িয়ে চলুন: অপ্রয়োজনীয় কিছু কেনার ইচ্ছা হলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অপেক্ষা করুন। ৩০ দিন অপেক্ষার অভ্যাস তাৎক্ষণিক কেনাকাটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

লেনদেনের ফি খেয়াল করুন: ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার ছোট ছোট চার্জও মাস শেষে উল্লেখযোগ্য ব্যয় তৈরি করতে পারে।

তবে শুধু ছোটখাটো খরচ কমালেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। বাড়িভাড়া ও ঋণের কিস্তির মতো বড় ব্যয়গুলো পর্যালোচনা করলে অনেক সময় বেশি সাশ্রয় করা সম্ভব হয়।

৪. জরুরি পরিস্থিতির জন্য সঞ্চয় গড়ুন

হঠাৎ অসুস্থতা, বাড়ির মেরামত কিংবা চাকরি হারানোর মতো পরিস্থিতিতে জরুরি তহবিল বড় সহায়তা হতে পারে। হাতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে তখন ঋণ বা ধার করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

সাধারণভাবে তিন থেকে ছয় মাসের প্রয়োজনীয় খরচের সমপরিমাণ অর্থ জরুরি তহবিলে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে কম আয়ের মানুষের পক্ষে শুরুতেই এত টাকা জমানো কঠিন। তাই প্রথমে ছোট একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, যা দিয়ে জরুরি কিছু খরচ মেটানো সম্ভব হবে। পরে সামর্থ্য অনুযায়ী সেই তহবিল বাড়ান।

সম্ভব হলে জরুরি তহবিলের টাকা দৈনন্দিন খরচের অর্থ থেকে আলাদা জায়গায় রাখুন। এতে প্রয়োজন ছাড়া সেই টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমে।

৫. বেতন পাওয়ার পরই সঞ্চয় আলাদা করুন

মাস শেষে টাকা বেঁচে গেলে সঞ্চয় করবেন—এমন পরিকল্পনা অনেক সময় বাস্তবায়িত হয় না। কারণ মাসের প্রয়োজনীয় ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে পুরো বেতনই শেষ হয়ে যায়।

এর পরিবর্তে বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সঞ্চয়ের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্ক আলাদা করে রাখুন। এরপর বাকি টাকা দিয়ে মাসের খরচ চালানোর পরিকল্পনা করুন। ব্যাংকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা স্থানান্তরের সুবিধা থাকলে সেটিও কাজে লাগাতে পারেন।

আরেকটি পদ্ধতি হলো ‘খামের বাজেট’। এতে মাসের শুরুতেই বাড়িভাড়া, বাজার, যাতায়াত, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচের জন্য আলাদা করে টাকা ভাগ করে রাখা হয়। ফলে প্রতিটি খাতে কত টাকা ব্যয় করা যাবে, তা স্পষ্ট থাকে।

৬. ঋণ পরিশোধে পরিকল্পনা করুন

ঋণের কিস্তি ও সুদের কারণে অনেকের মাসিক বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যায়। তাই ঋণ থাকলে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের জন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখা জরুরি।

একাধিক ঋণ থাকলে সুদের হার বেশি এমন ঋণ আগে পরিশোধের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। তবে কোনো ঋণের কিস্তি যেন বকেয়া না পড়ে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। নতুন ঋণ নেওয়ার আগে নিজের আয়, নিয়মিত ব্যয় এবং কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা ভালোভাবে হিসাব করে নিন।

৭. আয়ের বিকল্প উৎস খুঁজুন

খরচ কমানোরও একটি সীমা রয়েছে। তাই সম্ভব হলে বাড়তি আয়ের সুযোগ খোঁজা যেতে পারে। নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে পড়ানো, লেখালেখি, অনুবাদ, গ্রাফিক ডিজাইন কিংবা অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো কাজ থেকে অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব হতে পারে।

এ ছাড়া প্রশিক্ষণ নিয়ে নতুন দক্ষতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে ভালো বেতনের চাকরি বা কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বাড়তি আয়ের কোনো প্রস্তাবে টাকা বিনিয়োগ করার আগে সেটির বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা জরুরি। অল্প সময়ে বেশি আয়ের প্রলোভন দেখানো প্রতারণামূলক প্রস্তাব থেকে সতর্ক থাকুন।

প্রতি মাসে বাজেট পর্যালোচনা করুন

এক মাসের বাজেট সব সময় পরের মাসেও একই রকম থাকবে, এমন নয়। আয়, বাজারদর ও পারিবারিক প্রয়োজনের পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাবও বদলাতে পারে। তাই প্রতি মাসের শেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলিয়ে দেখুন। কোন খাতে বেশি খরচ হয়েছে, কোথায় সাশ্রয় করা গেছে এবং কোন পরিকল্পনা কাজে এসেছে, তা পর্যালোচনা করে পরের মাসের বাজেট তৈরি করুন।

কম বেতনে মাস চালানোর কোনো একক জাদুকরী কৌশল নেই। তবে নিয়মিত হিসাব রাখা, প্রয়োজনীয় খরচকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সামর্থ্য অনুযায়ী সঞ্চয় করা, ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং আয়ের নতুন পথ খোঁজার অভ্যাস আর্থিক স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।


কমেন্ট বক্স