যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন হিজাব পরিহিত পাঁচ মুসলিম নারী। তাদের মধ্যে চারজন অঙ্গরাজ্যের সিনেটর এবং একজন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দেশটির নির্বাচনি ইতিহাসে একসঙ্গে এতসংখ্যক হিজাব পরা নারীর জয়কে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর দেশটিতে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য, বিদ্বেষ ও হুমকি বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যেই পাঁচ মুসলিম নারীর এই জয়কে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের বিষয়টিও এই ফলাফলে উঠে এসেছে।
নির্বাচনে জয়ী পাঁচ নারীই প্রগতিশীল ধারার ডেমোক্র্যাট। তাদের মধ্যে জর্জিয়া থেকে অঙ্গরাজ্য সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন রুয়া রোমান। এর আগে তিনি জর্জিয়ার আইনসভায় প্রথম হিজাব পরা মুসলিম নারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ফিলিস্তিনপন্থি ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসেন রোমান। সে সময় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জাতীয় সম্মেলনে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত একজন বক্তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি উঠেছিল। তবে দলীয় নেতৃত্ব সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। জেরুজালেমে জন্ম নেওয়া দাদার নাতনি রোমানই ওই সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছিলেন।
নিউইয়র্ক থেকে অঙ্গরাজ্য সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আবের কাওয়াস। অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসা কাওয়াস আগে থেকেই রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচিত।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের ওপর নজরদারি ও ধরপাকড় শুরু হলে তার অনথিভুক্ত অভিবাসী বাবাকে গ্রেপ্তার করে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। প্রায় তিন বছর আটক থাকার পর তাকে জর্ডানে ফেরত পাঠানো হয়। বাবার আটকের সময় মায়ের সঙ্গে কারাগারের কাচের দেয়ালের ওপাশ থেকে তার সঙ্গে কথা বলার স্মৃতি এখনো কাওয়াসের মনে রয়েছে।
ইলিনয় অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ২৭ বছর বয়সী নাবিলা সৈয়দ। রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই রাজনীতিক। ২০২২ সালে একটি শূন্য আসনে মনোনয়ন পেয়ে অঙ্গরাজ্য আইনসভায় যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। স্বাস্থ্যসেবায় সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো তার রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অন্যতম।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর ওয়াশিংটনকে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ইলিনয়ের কয়েকজন আইনপ্রণেতার সঙ্গে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন নাবিলা। ওই চিঠির সমালোচনা করে কেউ কেউ একে হামাসের প্রতি সমর্থন হিসেবে আখ্যা দেন। তবে চিঠিতে ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না করে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
কানেকটিকাট থেকে অঙ্গরাজ্য সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া মেরিয়াম খান। রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে জয় পান তিনি। ২০২২ সাল থেকে অঙ্গরাজ্য আইনসভায় দায়িত্ব পালন করা মেরিয়াম বিশেষ শিক্ষা, বিচার বিভাগ ও শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কমিটিতে কাজ করেছেন।
চলতি বছরের শুরুতে কর্মস্থলের টেবিলে পাকিস্তানের ছোট একটি পতাকা রাখায় রিপাবলিকানদের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মেরিয়াম। নিজের পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক তুলে ধরে তিনি বলেছিলেন, নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের পরিপন্থী নয়।
অন্যদিকে মিনেসোটা থেকে পঞ্চমবারের মতো মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ইলহান ওমর। ২০১৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হওয়া চার মুসলিমের একজন ছিলেন। একই সঙ্গে কংগ্রেসের প্রথম হিজাব পরা নারী সদস্যও তিনি।
সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া ইলহান শরণার্থী হিসেবে ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। পরে ১৭ বছর বয়সে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন। তবে দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতাদের সমালোচনা ও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছেন তিনি।
সম্প্রতি তার বাড়িতে ভোররাতে অভিযান চালিয়ে মুঠোফোন, বহনযোগ্য কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করেন কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তারা। এ ছাড়া তার নাগরিকত্ব নিয়েও তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। ট্রাম্প একাধিকবার তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং তাকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করে দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইলহান।
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমবিরোধী প্রচারণার মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। মুসলিম জনসংযোগ পরিষদের নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট হারিস তারিনের মতে, নির্বাচনে মুসলিম নারীদের এই জয় প্রমাণ করেছে, ইসলামবিদ্বেষ ছড়িয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করার কৌশল সফল হয়নি।
তিনি বলেন, আগের নির্বাচনের তুলনায় ইলহান ওমর এবার বেশি ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। পাশাপাশি প্রকাশ্যে মুসলিম পরিচয় বহনকারী আরও কয়েকজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে এবারের নির্বাচনে ইসলামবিদ্বেষ কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কাজ করেনি।