ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬ , ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রশ্নবিদ্ধ মামলা, বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা!

নিউজ ডেস্ক
২ বছর আগে
প্রশ্নবিদ্ধ মামলা, বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা!
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনে দাবি আদায়ে বাংলা ব্লকেডসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এই আন্দোলনকে জামায়াত-বিএনপির সংশ্লিষ্টতা আছে এমন অভিযোগ এনে দমনের ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা ও তার সরকারের মন্ত্রীরা। সরকারের এমন ঘোষণার পর আন্দোলন দমনে নির্বিচারে নির্যাতন ও গণগ্রেফতার চালায় পুলিশ। এমনকি কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতনের আন্দোলন শুরু হলে সেখানেও নির্বিচারে গুলি করে আন্দোলনকারী ছাত্র জনতাকে হত্যা করে পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডাররা। শেখ হাসিনার সরকার ও তার মন্ত্রীদের প্রত্যক্ষ নির্দেশে সারাদেশে গণহত্যা চালিয়েছে পুলিশ। মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে পুলিশের গুলিতে ৮ শতাধিক মানুষকে হত্যা ও কয়েক হাজার ছাত্রজনতা আহত হয়।

গত পাঁচ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে গোপনে দেশ ছাড়া পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে এই সকল হত্যার ঘটনায় নিহতের পরিবার ও স্বজনরা হত্যার বিচারের দাবিতে একের পর এক মামলা দায়ের করছেন। আর এই সকল মামলায় ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, বেসরকারি বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকসহ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী বহু নেতা গ্রেফতার হয়েছেন। আন্দোলনে নিহত শিক্ষার্থীদের মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ আব্দুল্লাহিল কাফি। ঢাকার আরও দুই মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন সদ্য সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ও আরেক সাবেক আইজিপি শহিদুল হকসহ প্রতিনিয়তই প্রভাবশালী মন্ত্রী ও এমপিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন

তবে আন্দোলনে নিহত ছাত্র জনতার পরিবারের মামলায় শেখ হাসিনা সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য, দলের শীর্ষ নেতাদের নামের তালিকা দীর্ঘ হলেও আড়ালে রয়ে যাচ্ছেন হত্যায় সরাসরি জড়িত পুলিশ কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের মাঠ পর্যায়ের নেতারা। বরং একটি চক্র এই সকল হত্যার ঘটনাকে পুঁজি করে প্রতিপক্ষকে দমনে মাঠে নেমেছে। মামলার বাদীদের নানাভাবে ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে নিজেদের পছন্দ মতো আসামির তালিকা সাজাচ্ছে। অনেক মামলার বাদী আসামি কারা সেই বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না।

প্রশ্নবিদ্ধ মামলার উদাহরণ হতে পারে গত ২৮ আগস্ট রাজধানী যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের হওয়া মিরাজ হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া হামলাটি। ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক এলাকায় ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে নিহত হয় মিরাজুল ইসলাম (২১)।

নিহত মিরাজ লালমনিরহাটের আদিমারী উপজেলার বারঘরিয়া এলাকার আব্দুস সালামের ছেলে। ছেলে হত্যার ঘটনায় পিতা সালামের দায়ের করা মামলাটি যাত্রাবাড়ী থানায় হলেও সব আসামি লালমনিরহাটের বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগের নেতা। মামলায় ৪০ জনের উল্লেখ অজ্ঞাত ৩০০ জনকে আসামি করা হয়।

পেশায় সিএনজি অটোরিকশা চালক সালাম নিজ জেলার এত লোককে আসামি করার কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। তার দাবি আসামিরা স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাই তাদের আসামি করা হয়েছে।

আসামিরা তার ছেলে হত্যায় জড়িত কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মামলায় তিনজন সংসদ সদস্যের নাম রয়েছে। তারা জাতীয় রাজনীতি করে। তাদের পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

একইভাবে রাজধানীর বাড্ডা থানায় হৃদয় হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া আরেকটি মামলায় মাদারীপুরের শিবচর এলাকার ১৬১ জনকে আসামি করে একটি মামলা করা হয়েছে। মামলার প্রথম তিনজন আসামি হলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ছেলে সজিব ওয়াজেদ হয় ও বোন শেখ রেহানা। এছাড়া বাকি ১৫৯ জন আসামিই মাদারীপুরের সংসদ সদ্য মজিবুর রহমান নিক্সন থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। মামলার বাদী হয়েছেন মো. শাহাদাত হোসেন নামের এক বিএনপি নেতা। হৃদয় তার দলের কর্মী দাবি বলে দাবি করেন।

বাড্ডার ঘটনায় মাদারীপুরের দেড় শতাধিক মানুষকে আসামি করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হৃদয় আমার দলের কর্মী। সে আমাদের সঙ্গে আন্দোলনে গিয়ে নিহত হয়। আসামিরা সংঘবদ্ধ হয়ে বাড্ডা এলাকায় হৃদয়ের ওপর হামলা চালায়।

মাদারীপুরের এত লোক বাড্ডা এলাকায় কিভাবে আসলো জানতে চাইলে শাহাদাত বলেন, তারা সবাই মাদারীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য নুরে আলম চৌধুরীর লোক। তার ডাকে আসামিরা বাড্ডায় এসে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। নুরে আলম তাদের যেখানে ডাকে সেখানেই তারা যায়। তাই তাদের আসামি করেছি।

ঢালাওভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এমন মামলার বিচার পাবে কিনা জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বার্তা২৪.কমকে বলেন, যারা ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত না তাদের কোনোভাবেই আসামি করা ঠিক না। বিভিন্ন জেলার মানুষকে মামলার আসামি দেওয়ার মাধ্যমে মামলাটি দুর্বল হচ্ছে। যদিও তদন্তের ক্ষেত্রে একটি বিষয় থাকে, তদন্ত করে সত্যিকারার্থে যারা অপরাধী নয় তাদের নাম বাদ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

আইনের চোখে হামলা ও হত্যার ঘটনাগুলোতে শুধুমাত্র রাজনৈতিক পদ থাকায় আসামি করে হয়রানি করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিশ্চিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। সেই পুরোনো ফরমেটেই সব কিছু হচ্ছে। এই ফরমেট থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। গণহারে মানুষকে আসামি করে মামলা দেওয়ার পুরো বিষয়টিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে এবং শহিদদের প্রতি অসম্মান করা হচ্ছে। আর আইনগত দিক দিয়েও বিষয়টি সঠিক নয়। সূত্র-বার্তা২৪


কমেন্ট বক্স