ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ , ৩০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘শ্যুটার’ শামীম মোল্লার অন্ধকার জগৎ

শেখ নয়ন ফয়েজী
২ বছর আগে
‘শ্যুটার’ শামীম মোল্লার অন্ধকার জগৎ
শামীম মোল্লা। যাকে সবাই শ্যুটার শামীম মোল্লা বলেই জানতেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ৩৯তম ব্যাচের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও সাবেক ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার বাবা ইয়াজদ্দিন মোল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের কর্মচারী ছিলেন।

পোষ্য কোটায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন শামীম মোল্লা। অবৈধভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে উঠে চারজনের রুম একাই দখল করে রাখতেন। উল্লেখ্য পোষ্য কোটায় ভর্তিদের হল বরাদ্দ দেওয়া হয় না। চারজনের রুমে একাই রাজকীয়ভাবে থাকতেন তিনি। চলাচলের জন্য প্রচলিত হলের সিঁড়ি ও রুট ব্যবহার না করে জানালা ভেঙে মসজিদের ছাদের উপর দিয়ে আলাদা চলাচলের রাস্তা করেছিলেন তিনি। এই চলাচলের পথে কোনো জুনিয়র যদি তাকে সালাম না দিলে, তার ডাক পড়তো শামীমের রুমে। এরপর চলতো অকথ্য নির্যাতন। হলেই টর্চার সেল তৈরি করেছিলেন এই শামীম মোল্লা।

ক্যম্পাসে মোল্লা গ্যাংস্টার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। এজন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে উন্নত জাতের একটি জার্মান শেফার্ড কুকুর ক্রয় করেন তিনি। কুকুরের নাম রাখেন ‘সার্জেন্ট’। শামীম মোল্লা বলতেন, রাস্তায় সার্জেন্ট যেমন গাড়ি ধরে ঠিক তেমন আমার সার্জেন আমার শত্রুদের ধরবে। প্রতিদিন ২ কেজি গরুর মাংস খাওয়াতেন সার্জেন্টকে । কুকুরকে ইনজেকশন, ডাক্তার দেখানো ও দেখাশোনার জন্য প্রতিমাসে ৩০ হাজার টাকার ওপর খরচ হতো শামীমের। এই কুকুরকে দেখাশোনার জন্য দুইজনকে রাখতেন শামীম। বিকেলবেলা ক্যাম্পাসে বের হলে তার সাথে থাকতো কুকুর সার্জেন্ট, আর শামীমের কোমরে থাকতো পিস্তল। নিজেকে গ্যাংস্টার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে চাইতেন তিনি। শামীম মোল্লা হলের রুমগুলোতে নিজের অস্ত্রগুলো বালু দিয়ে ঢেকে রাখতেন আর কুকুরটি নির্দেশ দিতেন অস্ত্র খুঁজে বের করতে। পরিচিতিদের তিনি বলতেন , ‘এই ক্যাম্পাসে যত অস্ত্র আছে, সব আমি সার্জেন্টকে দিয়ে খুঁজে বের করাবো। অস্ত্র থাকবে শুধু আমার কাছে’।

একটি প্রাইভেটকার ব্যবহার করতেন তিনি। গাড়ির ডিকিতে লাঠি, রামদা, চাইনিজ কুড়াল থাকতো। মূলত হলে বসে জাবির পুরা মাদক সিন্ডিকেট, সাভার-আশুলিয়ার জমিদখল, ঝুট ব্যবসা ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। রাত হলেই হলের সামনে অনেক গাড়ি আসতো। তারা সোজা চলে যেতো শামিম মোল্লার রুমে। তার রুমে বসতো মাদকের আসর।

শামীম মোল্লা যে প্রাইভেট কারটি ব্যবহার করতেন, সেটি ছিল জাবির শিক্ষক মেহেদী ইকবালের। একবার ডাকাতির সময়ে তার এই গাড়িসহ কয়েজন কিশোরকে আটক করে পুলিশ। গাড়ি থেকে তখন উদ্ধার করা হয় রামদা, লাঠি, কুড়াল। আশুলিয়া থানা তদন্ত করে দেখতে পায় এই গাড়ি শামীম মোল্লার। এই কিশোর গ্যাংকে ব্যবহার করে এলাকার আরও দুই সন্ত্রাসী তাসকিন ও সময় গড়ে তুলেছিলো ত্রাসের রাজত্ব।

গত ৩ ফেব্রয়ারি জাহাঙ্গীরনগরে একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার মূলে ছিল মাদক কারবার। ঘটনা মূল আসামি বহিরাগত মামুন শামীম মোল্লার হাত ধরেই ক্যম্পাসে প্রবেশ করেন। সেসময় রাইফেল, চাইনিজ কুড়াল হাতে ক্যাডারদের বেশ কয়েকটি ছবি ভাইরাল হয়। যে রুমে এই ছবিগুলো তোলা হয়েছে সে রুমের দেয়ালে ছিল শামীম মোল্লার ছবি। কিন্তু এসব ঘটনার পরেও প্রশাসন ছিল নিশ্চুপ।

এদিকে গত ১৫ জুলাই দিবাগত রাতে জাবির আন্দোলনকারীদের উপর সরাসরি গুলি বর্ষণ করেন শামীম মোল্লা। শামীম ওইদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সামনে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে অস্ত্রটি চেক করেন। এছাড়া ওইদিন লেলিন, তারেক, রতন বিশ্বাসের হাতেও শটগান ছিলে। ওই হামলার মাস্টারমাইন্ডদের একজন ছিলেন শামীম। তিনি গেরুয়া থেকে ১০ পিকআপ বহিরাগত লোক নিয়ে আসেন হামলা করার জন্য। মুন্নী সরণি থেকে গুলি করতে করতে ভিসির বাসভবনের দিকে এগোতে থাকেন শামীম মোল্লা। ওই দিন ভিসির বাসভবনে একাধিক ব্যক্তি তাকে গুলি করতে দেখেছেন।

এর আগে, নিজ দলের একজনকে গুলি করে হাস্যরসের পাত্র হয়েছিলেন শামীম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক মো. মনসুর আলী পানধোয়া এলাকায় মাদক বেচাকেনা বন্ধ করতে চাইলে শামীম মোল্লা ও তাসকিন গ্যাং প্রকাশ্যে ওই শিক্ষকের ওপর কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। তবে ওই সময় কোমর থেকে পিস্তল বের করতে গিয়ে নিজ দলের আরেক ক্যাডারের গায়ে একটি গুলি লাগে। ওই সহকর্মীর নাম আবুল হোসেন। এ ঘটনায় ২০২২ সালের ৬ আগস্ট আশুলিয়া থানায় একটি মামলা (নং-২২) দায়ের করেন ওই শিক্ষক। তবে অস্ত্রের মুখে তার ছেলেকে জিম্মি করে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করেন শামীম। ২০২১ সালে প্রভাষক মনসুর প্রতিবেশী অধ্যাপক হাবিবুল্লাহর ওপর চড়াও হয়েছিলেন শামীম।

সরেজমিনে এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও পার্শ্ববর্তী আমবাগান, পানধোয়া, সেনওয়ালিয়াসহ আশপাশের এলাকায় ডিশ, ইন্টারনেট ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন ছাত্রলীগ নেতা জাহিদুল হক সময় ও তার সহযোগী মাদক ব্যবসায়ী মো. তাসকিন খান। তারা দুইজনই শামীম মোল্লার অনুসারী।

আরও জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকার জিনিয়া ৪ নামক ভবনের প্রথম তলায় ২০২১ সাল থেকে অবিবাহিত শামীম মোল্লা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে তিনি এই বাসায় থাকতেন। জানা যায় তিনি কখনও বাসা ভাড়া দেননি।

এ ব্যাপারে ওই বাড়ির বাড়িওয়ালা শিল্পী রোজিন বলেন, আমি ঐ ভবনে থাকি না। যার কারণে তার সাথে দীর্ঘদিন দেখা ও কথা হয়নি। তার কাছে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা ভাড়া বাবদ পাওনা আছে। তার মৃত্যু পর এখন তার জিনিসপত্র বের করে ভবনের বাইরে রেখেছি।

সেনওয়ালীয়া গ্রামের ইটবালু ব্যবসায়ী বেলাল হোসেন চৌধুরীর কাছে অস্ত্রের মুখে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে শামীম মোল্লা গ্যাং। পরে এই বিষয়ে একটি মামলা হয়। যার মামলা নম্বর ১০১। ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে ইসলামনগরের রহিম নামে এক ব্যক্তির সম্পত্তি জোর করে অন্যের নামে লিখে দেন শামীম মোল্লা।

এছাড়া ময়লা অপসারণের ঠিকাদারিকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে শামীম গ্রুপ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই ইসলামনগর, পানধোয়া, আমবাগানসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে গত ৭ মাস ধরে ময়লা অপসারণের কাজ করে আসছিলেন ইমাম হোসেন। গত ৪ মার্চ ময়লা নেওয়ার বিল তুলতে গেলে ইমামের স্টাফ মুন্নাকে ইট দিয়ে মেরে জখম করে দেয় শামীম গ্রুপের সদস্যরা। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন মুন্না ও পৃথক জিডি করেছেন ইমাম হোসেন। তবে ক্যাম্পাসের ছাত্রদের নাম শুনে তাদের নামে থানা অভিযোগ নিতে চায়নি বলে জানিয়েছেন ইমাম। পরে ইমামের ছেলেকে জিম্মি করে অভিযোগ তুলে নিতে বাধ্য করে শামীম গ্রুপ।

সর্বশেষ সাভার থানায় জুলাই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় শামীমের বিরুদ্ধে চারটি মামলা হয়েছে। হত্যা মামলার আসামি হয়েও অদৃশ্য শক্তির বলে তিনি সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছেন।


কমেন্ট বক্স